ব্যাংকে সুদের হার কমে যাওয়ায় ডেপজিটের হারও কমে যাচ্ছে




২০১৬ সালের চেয়ে ব্যাংক ডেপজিটে প্রবৃদ্ধির হার নিম্নগামী এর কারণ আমানতকারীগণ অল্প সুদের হারে ব্যাংকে অর্থ ডেপজিট করতে নিরুৎসাহিত বোধ করেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমানত বৃদ্ধির হার,গত বছরে  ১৩.০৮ থেকে ১৩.১৩% তবে তার আগের বছরের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, সে বছর আমানত প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে ১২.৫৮ শতাংশ থেকে ১৫.৩২ শতাংশ হয়েছিলো।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুযায়ী, ডিপোজিট বৃদ্ধির হার কমার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে ব্যাংক প্রদত্ত নিম্ন সুদের হার।

সেপ্টেম্বর, ২০১৬ তে প্রবৃদ্ধির হার ১৩.৫% এ নেমে যায় যেখানে ২০১৫ এর জুনে এ হার ছিল ১৪.৪৬।  ডিসেম্বরে আমানত বৃদ্ধির হার আবার ১৩.১৩% এ চলে আসে।

অন্যদিকে ডিসেম্বরে ক্রেডিট বৃদ্ধি হার বেড়ে ১৫.৩২% হয়েছে যেটা সেপ্টেম্বর, ১০১৬ তে ছিল ১৪.৫% এবং জুনে ছিল ১৫.৪২%। 

ব্যাংকার্স এবং বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমানতকারীগন এখন তাদের বিনিয়োগে উচ্চ লাভ পাওয়ার জন্য সরকারী সঞ্চয় প্রকল্প এবং শেয়ার বাজারে তাদের টাকা বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত বোধ করেন।

তাঁরা আরও বলেন,কিছু আমানতকারিগন নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তাঁদের অর্থ ডেপজিট করতে পছন্দ করেন কারণ নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টার্ম ডেপজিটের ক্ষেত্রে চড়া সুদ অফার করে।

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টার্ম ডেপজিটের ক্ষেত্রে প্রায় ৬% থেকে ১৬% সুদ দেয় যেখানে ব্যাংক দেয় .১০% থেকে সর্বোচ্চ ৯.৫০%।

নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ৬ মাসের পরিবর্তে ৩ মাসের জন্য ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানকে ফিক্সড ডেপজিট করার সুযোগ দিচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ রিপোর্ট অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো সঞ্চয়ী ডেপজিটে .৪০% থেকে ৬% সুদ অফার করে।

 "সুদের হারের এই ধরনের পতনশীল প্রবণতা ব্যাংকিং খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধির তুলনায় সামগ্রিক আমানত বৃদ্ধি নিচে ঠেলে দিয়েছে," বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (বিবি) বলেন।

তিনি আরো বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঋণ ও ঋণের সমন্বয় অনুসারে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এন্টারপ্রাইজ (এসএমই) খাতে আমানত-বৃদ্ধির হার কিছুটা হিংস্র।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক অনুযায়ী, আমানত এবং ক্রেডিট মধ্যে এ ধরনের তুলনামূলক প্রবণতা ফেব্রুয়ারি শেষ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল।

গত ডিসেম্বরে, সকল ব্যাংকের আমানত, আন্তঃব্যাংক অর্থ ব্যতীত ৯০৮৮.৬৪ বিলিয়ন যেখানে জুন ৩০, ২০১৬ তে এই পরিমান ছিল ৮৫৮৩.৩১ বিলিয়ন টাকা।ডিসেম্বর ২০১৫ অনুযায়ী সমষ্টিগত আমানত ছিল ৮০৩৩ বিলিয়ন টাকা।

অন্যদিকে, তাদের অসামান্য ঋণ, ডিসেম্বর ২০১৬, আন্তঃব্যাংক ভারসাম্য ব্যতীত টাকা ৬৪২১.৭৪ বিলিয়ন থেকে বেড়ে ৬৮৬৪.৮০ বিলিয়ন হয়। ডিসেম্বর ২০১৫ তে এই অর্থের পরিমান ছিল ৫৯৫৩ বিলিয়ন।

 সাবেক গভর্নর সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, "আমানতকারীদের, বিশেষ করে ছোট অংকের আমানতকারীগন, এখন প্রধানত নিম্ন সুদের হারের কারণে ব্যাংকগুলোতে আরও আমানত তৈরীর আগ্রহ হারাচ্ছে,"

এছাড়া, আমানতের এমন নিম্ন সুদের হার,বিশেষত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় মানুষের সঞ্চয়ের অভ্যাস ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে,ডঃ আহমদ ব্যাখ্যা করেন।

"এই ধরনের নিরুৎসাহিত সঞ্চয়ের প্রবণতা মুদ্রা ব্যাংকের বাইরে ঠেলে দিয়েছে” সাবেক গভর্নর বলেন।

এক বছর আগে সামগ্রিক মুদ্রা ব্যাংকের বাইরে (ব্যাংক একাউন্টে জমা রাখার পরিবর্তে ঐতিহ্যগত ক্যাশে টাকা রাখা) টাকা ৯২৫.৪৫ বিলিয়ন থেকে ডিসেম্বর ২০১৬ সালে ২২.২৭ শতাংশ বা ৳ ২০৬.০৮ বিলিয়ন টাকা বেড়ে ১১৩১.৫৩ বিলিয়ন হয়, বিবি তথ্য দেখিয়েছে।

সঞ্চয়ের সঙ্গে এমন একটি পরিস্থিতির উপর তাঁর মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করা হলে, এস কে সুর চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে সব তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের(সিইও) প্ররোচক থাকা এবং আমানতের পতনশীল সুদের হার পরীক্ষায় সাহায্য করার জন্য একটি নির্দেশনা জারি করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পদক্ষেপ ঋণের হার তুলনায় আমানত হার দ্রুত অধ: পতন এর বিরুদ্ধে নেয়া হয়েছিল।

মাত্র ৩ মাসের ব্যবধানে ডিসেম্বর, ২০১৬ তে আমানতের ভরযুক্ত গড় সুদের হার ৫.৩৯ শতাংশ থেকে নেমে ৫.২২ তে পৌঁছায়।গত জুনে ব্যাংক দ্বারা পরিশোধিত এই অর্থের পরিমান ছিল শতকরা ৫.৫৪ ছিল।

বিবি প্রতিবেদনের ফলাফল অনুযায়ী, ২০ টির ও বেশি ব্যাংকে গড় ডেপজিট ৫% নিচে নেমে গেছে ডিসেম্বর, ২০১৬ তে।
অপরপক্ষে, ৩ মাসের ব্যবধানে ঋণের উপর ভরযুক্ত গড় সুদের হার শতকরা ১০.১৫ থেকে নেমে শতকরা ৯.৯৩ তে নেমে আসে ডিসেম্বর, ২০১৬ তে।গত জুনে যেটা ছিল ১০.৩৯।

জানুয়ারী ২০১৭ তে, এক মাসের ব্যবধানে আমানতের ভরযুক্ত গড় সুদের হার ৫.২২% থেকে নেমে ৫.১৩% এসে দাঁড়ায় যেখানে ঋণের উপর ভরযুক্ত গড় সুদের হার ৯.৯৩% থেকে নেমে ৯.৮৫% এ পৌঁছায়।

জনাব কে সুর চৌধুরী বলেন, "আমরা আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য সর্বোত্তম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি," 

তিনি বলেন, এটি কম উৎপাদনশীল খাতে খরচ করার ক্ষেত্রে মানুষকে নিরুৎসাহিত করতে সাহায্য করবে।

তিনি আরো বলেন, আমানতের সুদের হারের এ পতনশীল প্রবণতা মানুষকে সঞ্চয়ের অভ্যাস থেকে দূরে সরিয়ে দিয়ে অনুৎপাদনশীল খাতে এবং অযথা ব্যয় করার দিকে প্ররোচিত করছে। 

যাইহোক, সকল ব্যাংকের ক্রেডিট-আমানতের অনুপাত (সিডিআর) - আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রিম-আমানত অনুপাত (এডিআর) নামে পরিচিত এটি ৩০ শে জুন ছিল ৭১.৫৯% এবং ডিসেম্বরে এটা বেড়ে ৭১.৮৫% এ দাঁড়ায়। ডিসেম্বর, ২০১৫ তে এটা ছিল ৭০.৯৮%।

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর আগে প্রচলিত ব্যাংকগুলোর জন্য ৮৫ শতাংশ এবং শরিয়া ভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকগুলোর জন্য ৯০ শতাংশ সিডিআর নিরাপদ সীমা নির্ধারণ করে ছিল।

ঢাকা ব্যাংক লিমিটেড এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন,সরকারের প্রস্তাবকৃত সঞ্চয় পণ্যের ক্ষেত্রে উচ্চ সুদের হার আমানতকারীদের ব্যাংক ডেপজিট ভেঙে উচ্চ ফলনশীল দ্রব্য ক্রয়ে উৎসাহিত করছে। 

একজন সিনিয়ন ব্যাংকার জানান, বর্তমানে বাণিজ্যিক ব্যাংক দ্বারা প্রদত্ত আমানতের গড় সুদের হার শতকরা ৫ এর বেশি যেখানে সঞ্চয় পণ্যে গড় সুদের হার শতকরা ১১।

জনাব রহমান বলেন,“যদি আমানত বৃদ্ধির বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে ব্যাংক ভবিষ্যতে তাদের তহবিল পরিচালনার জন্য সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে” 

Kamrunnahar Dana এর ছবি

About the Author

About: 

আমি ডানা, জাহাংগীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স বিষয়ের ওপর এমএস করছি। জীবনের লক্ষ্য বাবার একজন সার্থক সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সার্থক স্নাতক, সার্থক চাকুরীজীবি এবং ভবিষ্যতে একজন সার্থক গৃহিণী, সার্থক মা সর্বোপরি একজন সার্থক আমি হওয়া।